Sunday, December 18, 2022

বাঁক

 

বাঁক শব্দটি প্রতি মুহুর্তে এক অদ্ভুত কৌতূহল বা রোমাঞ্চ নিয়ে আসে, তা সে রাস্তার বাঁক হোক বা জীবনের বাঁক। প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা আকস্মিকতা যে কোন মুহুর্তে যাত্রার মোড় ঘুরিয়ে অন্য এক নতুন দিশার দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাস্তার বা নদীর বাঁকের মতো জীবনের প্রতিটি বাঁকও আকস্মিক আর অপ্রত্যাশিত হয়

জীবন মাঝেমধ্যেই সঠিক অভিমুখে এক আকস্মিক ভুল বাঁক নেয় যা তাকে এক অন্য দিকে নিয়ে যায়। আবার কখনও ভুল পথে সঠিক বাঁক নিয়ে জীবন এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবের সামনে এসে দাঁড়ায় বা ভিন্ন লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। জীবন একটা রাস্তার মতো যেখানে প্রতিটি বাঁকে কোন না কোন রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে

বাঁক কখনও রুক্ষ শুষ্কতা এনে জীবনকে একটা কঠিনতার মুখোমুখি দাঁড় করায়; আবার কখনও বাঁক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই কঠিনতা কোন বিশল্যকরণীর ছোঁয়া পেয়ে নতুন ভাবে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। জীবন মাঝে মধ্যে কোন কোন বাঁকে এই ভাবে জাগিয়ে তোলে

এক বিখ্যাত উক্তি হলো "রাস্তার মোড় কখনোই একটা রাস্তার শেষ নয় যতক্ষণ না কেউ রাস্তার বাঁক নিতে অসমর্থ হয়"। কেউ যদি ভাবে যে রাস্তাটা সবসময় সরলরেখার মতো সোজা হবে, তাতে কোন বাঁক আসবে না তবে সে জীবনের সবথেকে বড় অনভিজ্ঞ যাত্রী তৈরী হবে। জীবনে যত ঘাত প্রতিঘাত আসবে, যত বাঁক আসবে তত প্রতিকূলতার সঙ্গে মানাতে পারবে, তত নতুন অভিজ্ঞতার সঞ্চার হবে এবং অভিজ্ঞ যাত্রী হিসাবে প্রমাণিত হবে।

যাত্রাপথে যখনই বাঁক আসবে তখন সেই পথে এগিয়ে যেতে হয়; কারণ এটা মনে রাখতে হবে যে এক একটা যাত্রাপথ একটা অভিযান যেখানে একমাত্র এগিয়ে গেলেই কোন লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে, নতুন দিশার সন্ধান পাওয়া যাবে। জীবনের পথে উপস্থিত এই বাঁকই হয়তো নতুন কোন লক্ষ্যে নিয়ে গেলো যা কারও কল্পনার অতীত ছিল। এই বাঁকের জন্যই আবার নতুন রূপে নতুন করে সব পুনরুজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সামান্য থেকে বিশেষ আর শূণ্যতা থেকে পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়। তাই জীবনের কিছু বাঁকে জেগে উঠতে হয়, নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে হয়।


ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, November 13, 2022

মনের ভাব


মন বড় অদ্ভুত এক সৃষ্টি যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে প্রকাশিত হয়। কখনও রাগ, কখনও দুঃখ, আবার কখনও ভালোবাসা, আনন্দ - মনের এই বিভিন্ন ভাব পরিবেশ ও পরিস্থিতির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়।

মনের এই ভাবের পেছনে বিজ্ঞানীরা হয়তো বিভিন্ন জীবতত্ত্বের ব্যাখা দিয়েছেন; কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে সেগুলো বিভিন্ন অনুভূতির প্রকাশ হয়ে ধরা দিয়েছে। এইসব অনুভূতি লাল, নীল, গোলাপি, সবুজ, কালো ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের মাধ্যমে চিত্রিত হয়েছে। একই ভাব একই সময়ে ভিন্ন ভাবে ভিন্ন লোকের কাছে ধরা পড়েছে - কারও কাছে ভালোবাসা তো কারও কাছে ভালোলাগা, আবার কারও কাছে বিরহ।

প্রত্যেকেরই মন আছে আর তার সাথে আছে সেই মনের বিভিন্ন অনুভূতি। জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে সৃষ্ট সেই অনুভূতিগুলি প্রত্যেকেই অনুভব করে এবং বিভিন্ন ভাবে বিভিন্ন জনের কাছে তা প্রকাশ করে। কারও কাছে ভালোবাসা, আনন্দ, কৃতজ্ঞতা আবার কারও কাছে রাগ, ঘৃণা, ভয় - বিভিন্ন রূপে এরা প্রকাশিত হয় যা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করে সেই সময়ের পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিবর্গের ওপর।

একজনের মন যদি আর একজনের মনের সাথে মিল খুঁজে পায় তবে ভবিষ্যতেও সেই মনের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদান করে। আর যদি অন্য মনের সাথে মিল খুঁজে না পায় তবে সেই সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী হয় সেই মন এই মনের ভাবের ভার বহনে অক্ষম। সবাই ভার কমাতে চায়, বইতে বা বাড়াতে নয়। এক ভাব কমলে বা দূর হলে তবেই অন্য ভাবের উদয় হয়।

একজন মানুষ যখন তার মনের ভাবের ভারে বিহ্বল হয়ে পড়ে সে সেই ভাবের ভার কমানোর জন্য অন্য কাউকে খোঁজে এবং তাকে সেটা দিয়ে দেয়। একজনের মন আরেকজনের মনের ভাবের রঙে রাঙায়িত হয়ে কখনও আনন্দে মেতে ওঠে, কখনও দুঃখে কেঁদে ওঠে, আবার কখনও রাগে গর্জন করে ওঠে। প্রতিনিয়ত এক মন তার ভাব প্রকাশের জন্য আর এক মনকে খুঁজে চলেছে।



ঋতুপর্ণা বসাক

Monday, October 31, 2022

উৎসব



'উৎসব' নামের মধ্যেই এক খুশীর ঢেউ খেলে যায় মনের মধ্যে। উৎসব মানে আনন্দ, ভালোলাগা, সমৃদ্ধি। উৎসব মানে মনের মিল, প্রিয়জনের দেখা পাওয়া, সব কষ্ট ভুলে আনন্দে মেতে ওঠা। সবাইকে এক হওয়ার, কাছাকাছি আনার, দূরত্ব মেটাবার মাধ্যম হলো উৎসব। উৎসবে সবাই অশুভ সব মিটিয়ে শুভ কে আহ্বান করে নতুন পথ চলার অঙ্গীকার করে। 

উৎসব মানেই বৈচিত্র্য যেখানে বিভিন্ন রং, ধর্ম, জাতি, দেশ সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যতা হারিয়ে এক নতুন সৃষ্টিতে সবাই যোগদান করে। প্রত্যেকে উৎসবের তার নিজস্ব মাহাত্ব আছে যা অন্য আর এক উৎসব থেকে তাকে আলাদা করে। প্রতিটি উৎসবের নিজস্ব ইতিহাস, আচার আচরণ, বৈশিষ্ট্য আছে যা একটি দেশের বা সমাজের সংস্কৃতির ধারক হিসাবে কাজ করে।

উৎসব মানেই স্মৃতি। বছর বছর একই উৎসব বিভিন্ন স্মৃতি তৈরী করে যা আগামী দিনে বেঁচে থাকার ভালো থাকার রসদ জোগায়। আবার কখনও বা অতীতের কোন বেদনাদায়ক ঘটনা দুঃখের স্মৃতি বহন করে আনে যা কষ্ট দেয়, পুরোনোকে মনে করায়। উৎসব মানেই ভালো খারাপ মিলিয়ে এক নতুন মেলবন্ধন যেখানে সবাই পুরোনোকে সঙ্গী করে নতুন ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়।

উৎসব একটা আবেগ যা সবার মধ্যে বিদ্যমান; কারণ এই উৎসবেই সবাই সারা বছরের ক্লান্তি দূর করে একে অপরের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠে। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিযোগিতার চাপে হারিয়ে যাওয়া মানুষরা উৎসবের মধ্যে দিয়ে তৃপ্তির শ্বাস নেয়, নিজের অনুভূতিগুলো অনুভব করে, নিজের সাথে এবং সবার সঙ্গে সময় কাটাতে পারে। তাই হয়তো সারা বছর সবাই তাদের এই প্ৰিয় উৎসবের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে। উৎসব হলো সব ধার্মিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক মনোভাবের মিলনক্ষেত্র


ঋতুপর্ণা বসাক

Tuesday, October 18, 2022

সময়, এইসময়, ঐসময়, সুসময়, দুঃসময় - সবসময়

সময় সৃষ্টির বড়ই অদ্ভুত এক আবিষ্কার যা আমাদের সবকিছুর সাথে পরিচয় করায়, মানিয়ে নিতে শেখায়। সময় প্রতি ক্ষণে আমাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে শেখায়। আজ যা আছে কাল তা নাও থাকতে পারে। আজকের পরিবেশ কাল পরিবর্তন হয়ে যেতেও পারে। সময়ের হাত ধরেই সবাই শৈশব থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, যৌবন থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয় এবং পরিশেষে অন্তিম যাত্রার পথিক হয় । সবই সময়ের ব্যাপার।

ভালো সময় সবাই চায় কারণ তখন সব ভালো হয় - সমৃদ্ধি, উন্নতি, প্রশংসা, প্রিয়জন সব পাশে থাকে। আর খারাপ সময় মানেই এগুলির অনুপস্থিতি। কিন্তু খারাপ সময়ের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হল সে প্রকৃত বন্ধু চিনতে শেখায়। ভালো সময়ে তোমার কাছে সব আছে, তোমার থেকে সবাই নেবে, তাই তোমার পাশে থাকে। কিন্তু খারাপ সময়ে তোমার কাছে কিছু নেই, তোমাকে দেবে বা সাহায্য করবে। আর সেটা কতজন করে সেটাই খারাপ সময় চিনতে শেখায়।

সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সে তার গতিতেই চলে। প্রতিটি সময়ের নিজস্ব দাম আছে। সঠিক মুহুর্তের জন্য অপেক্ষা না করে প্রতিটি মুহুর্তকে কাজে লাগানোই সঠিক সিদ্ধান্ত। সময়কে কেউ ধরে রাখতে পারে না কিন্তু সেটাকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করে তার গুরুত্ব বাড়াতে পারে। কারণ একবার যে সময় চলে যায় তাকে হাজার চেষ্টা করেও ফিরে পাওয়া যায় না। তাই যে সময় বর্তমানে উপস্থিত তাকে ভালো ভাবে উপভোগ করতে হয়, নয়তো পরে আফসোশ করতে হয়।

এটা ঠিক সময় বহমান, তার ওপর কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু এটাও ঠিক যে সেই সময়কে কিভাবে কাজে লাগানো হবে সেটা নির্ভর করে মানুষের ওপর। প্রতিটা মানুষ সবচেয়ে বেশি যেটা চায় সেটা হল সময় কিন্তু সবচেয়ে বেশি সেটাই সে নষ্ট করে। যে মানুষ যতটা ভালো ভাবে সময়কে কাজে লাগাতে পারবে তার কাছে সময় ততটাই সুহৃদ হয়ে উঠবে। আর এই ব্যবহৃত সময়ই ভবিষ্যতে বিভিন্ন সুখ দুঃখের স্মৃতি বহন করে। ভালো ভাবে কাজে লাগালে তা সুখকর স্মৃতি আনবে, আর ভুল ভাবে কাজে লাগালে দুঃখ হবে এবং নতুন শিক্ষা পাবে ।

সময়ের বিস্তার সর্বত্র। স্বয়ং ঈশ্বরও সময়কে বাদ দিয়ে চলতে পারেন না। সেখানে প্রতি মুহুর্তে জগতে সময়ের প্রভাব অসীম। তা সে এক সেকেন্ড, এক মিনিট, এক দিন, এক মাস, এক বছর - যাই হোক না কেন। প্রত্যেকের নিজস্ব গুরুত্ব আছে। সময় খুব সুন্দরভাবে জীবনে যেটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ সেটা দেখিয়ে দেয়। সম্পর্কের সমীকরণগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। প্ৰিয় থেকে অপ্রিয়, প্রিয়জন থেকে প্রয়োজন, গুরুত্ব থেকে বিরক্ত সবই সম্ভব - পার্থক্য টা শুধু সময়ের।


ঋতুপর্ণা বসাক

Monday, June 20, 2022

ব্যথার কথা

 


আমাদের জীবনে খুব প্রচলিত এবং ব্যবহৃত একটা শব্দ হল ব্যথা। সবাই আমরা এর সঙ্গে ভীষণ ভাবে পরিচিত। আজ একটু ব্যথার কথাই শোনা যাক।

আচ্ছা ব্যথা দেখতে কি রকম হয়? তার কোন রং আছে কি - লাল, নীল, হলুদ, বা সবুজ? না কি সে শুধুই ধূসর বা সাদা বা কালো? ব্যথাও কি কখনও ব্যাথা পায়? সে কি কখনও কষ্টে কেঁদে ওঠে বা আনন্দে হেসে ওঠে? আমরা কি কখনও তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি বা তার মনের কথা জানার আগ্রহ দেখাই?

কখনও যদি ব্যথার সঙ্গে কথা বলা যায় তাহলে দেখা যাবে তারও হয়তো একটা জীবন আছে যেখানে সুখ দুঃখ, হাসি কান্না সব আছে। ব্যথাও হয়তো ব্যথা দিয়ে গান বাঁধে, কবিতা লেখে; কখনও আনন্দে নেচে ওঠে আবার কখনও হয়তো অভিমান করে বসে থাকে। ব্যথারও জীবনে হয়তো ঝড় আসে, সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে যায়, আবার সবশেষে নতুন করে সব শুরু করে।

ব্যথারও তো ভাগ আছে, তাদের সঙ্গে কি কখনও কথা বলেছি? শারীরিক বা মানসিক - দুই ব্যথার ব্যথা যে আবার দুরকম। শরীরিক ব্যথার হাজার ওষুধ আছে যা হয়তো সময়ের সঙ্গে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু মানসিক ব্যথা? সে তো হাজার ওষুধেও যায় না, মনের কোন না কোন কোনায় রয়ে যায়। তার কি কিছু নিরাময়ের কোন চেষ্টা করি?

ব্যথার কি মন আছে? সেই মন কি কখনও রাগে, দুঃখে সব ছেড়ে হারিয়ে যেতে চায়? জানি না। হয়তো আছে; হয়তো সেই মন ব্যথা পেয়ে সব উৎসাহ হারিয়ে এক অজানার উদ্দেশ্যে নিখোঁজ হয়ে যেতে চায়, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পাড়ি দিতে চায়। আবার কখনওবা ব্যথার সেই মন ব্যথা পেয়ে সমাধানের পথ খুঁজে তার ব্যথা সারানোর চেষ্টা করে।

ব্যথার জীবন কি সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উথালপাথাল করে না কি জলাশয়ের জলের মতো শান্ত স্থির থাকে? তার জীবনও হয়তো অনেক বৈচিত্রময়; কখনও উদ্দাম, বাঁধাহীন আবার কখনও বা ধীর, স্থির। কখনও প্রানোচ্ছল গতিতে আনন্দের সাথে এগিয়ে চলেছে, আবার কখনও নিশ্চুপ হয়ে বিষাদের গান গাইছে। ব্যথাও হয়তো কোথাও প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে

ব্যথার থেকে সবাই পালাতে চায়, তাকে অস্বীকার করতে চায় যেন তার কোনও অস্তিত্বই নেই; বা তার কথা ভাবলে সে যেন বেশি কষ্ট দেবে। কিন্তু ব্যথার থেকে পালালে ব্যথা আরও আঁকড়ে ধরে কারণ ব্যথারও যে আর কেউ নেই যার সাথে সে কথা বলবে, যাকে সে তার মনের গাথা শোনাবে। তাই ব্যথার থেকে না পালিয়ে তাকে আলিঙ্গন করে যদি তার কথা শোনা যায় তাহলে হয়তো তার ব্যথা কমবে এবং তার সাথে আমাদেরও কারণ ব্যথা তো আমাদেরই অংশ, সে তো আমাদের ভেতরেই আছে।


ঋতুপর্ণা বসাক

Saturday, May 28, 2022

ধন্যবাদ!

 

ধন্যবাদ

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে থাকতে গেলে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হয়, একে অপরের বিপদে আপদে সাহায্য করতে হয়, সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কাজ মিটে গেলে একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করা যা আজকের যুগে অত্যন্ত প্রবল।

'ধন্যবাদ' বা 'Thank you' খুব ছোট্ট শব্দ, কিন্তু তার অর্থ এবং ফল দুটোই খুব বড়। কাউকে ধন্যবাদ দেওয়ার অর্থই হলো তার কাজ বা সাহায্য বা সমর্থন কে উপলব্ধি করে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। এর ফলে সেই ব্যক্তির সমস্ত পরিশ্রম সার্থক হয় এবং সে তার সেই কাজের মধ্যে জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়।

যখন আমাদের দরকার হয় তখন যার থেকে সাহায্য পাবো তাকে ব্যস্ত করে ছাড়ি। কিন্তু যেই কাজটা হয়ে গেলো আর তাকে মনে রাখি না, তার কাজের যথার্থ মূল্যায়ণ করার চেষ্টা করি না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সামান্য ধন্যবাদ টুকুও দিতে ভুলে যাই। জীবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষজন আমাদের পাশে থাকে, সাহস যোগায়, সাহায্য করে; কিন্তু সবসময় আমরা বোধহয় তাদের যথার্থ সম্মান জানাতে পারি না। স্বয়ং ঈশ্বরকেও আমরা বাদ দিই না। তাঁর কাছে আমরা সবসময় চেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু যেই সেটা পেয়ে গেলাম আর তাঁকে মনে রাখি না। তাঁকেও যে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত সেটাই আমাদের মনে হয় না।

ধন্যবাদ সবসময় কথায় দেওয়া যায় না। বিভিন্ন মাধ্যমেও ধন্যবাদ প্রকাশ করা যায়, তা সে অর্থ হোক বা উপহার বা কোন কিছুর অঙ্গীকার। ধন্যবাদ শব্দের মাধ্যমে আমরা একে অপরের পরিশ্রমকে সম্মান জানাই যা আমাদের জীবনের পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ যোগায়। ধন্যবাদ শব্দের মাধ্যমে আমরা একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যা পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে সাহায্য করে।

কাউকে বলা একটা ছোট্ট 'ধন্যবাদ' বা 'Thank you' হলো সেই জাদু চাবিকাঠি যা অনেক মনের বন্ধ দরজা খুলে সেখানে প্রবেশের অধিকার দেয়। ধন্যবাদ একজন মানুষের পরম কৃতজ্ঞতা,  নম্রতা এবং উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবনে শুভ অশুভ যাই আসুক না কেন তাকে গ্রহণ করে স্বীকৃতি দেওয়াই হলো জীবনের সমস্ত সম্পদের প্রধান ভিত্তি। কথায় বলে,

When life is sweet, say thank you and celebrate.

When life is bitter, say thank you and grow.


ঋতুপর্ণা বসাক

Thursday, April 28, 2022

দূরত্ব



'দূরত্ব' কথাটার মধ্যেই কেমন যেন একটা মন খারাপের গল্প লুকিয়ে রয়েছে। দূরত্ব মানেই যেন একটা অদৃশ্য পাঁচিল তৈরী হবার গল্প তা সে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে কোন রকম দূরত্বই হোক না কেন। সব ক্ষেত্রেই এই পাঁচিল গড়ে ওঠার পেছনে কোন কারণ অবশ্যই থাকে। কিছু দূরত্ব আমরা নিজেরা তৈরী করি আর কিছু কোন অদৃশ্য কারণ থেকে গড়ে ওঠে। কিছু দূরত্বের জন্য নিজেরাই দায়ী থাকি আবার কিছু দূরত্ব পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে যায়।  

সমাজে থাকতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন লোকজন, পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হই; কোথাও সম্পর্ক খুব ভালো হয় কোথাও বা হয় না। অনেকক্ষেত্রে সম্পর্কে অসুস্থতা বোধ করলে সেখানে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। সেক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যই সুস্থ থাকে।আবার অনেক ক্ষেত্রে সামান্য মনোমালিন্যে, ভুল বোঝাবুঝিতে দূরত্ব তৈরী হয়। দূরত্বের ফলে একে অন্যের গুরুত্ব বুঝতে পারে।সেক্ষেত্রে মিটিয়ে নেওয়ার একটা ইচ্ছে তৈরী হয়। কেউ কেউ সেটা বিভিন্ন প্রচেষ্টার দ্বারা মিটিয়ে নেয়, কেউ সেটা পারে না। যারা পারলো না সেখানে দূরত্বটা বাড়তে থাকে। আর এই ক্রমবর্ধমান দূরত্বটা একসময় এতটাই বেড়ে যায় যে হাজার চেষ্টা করেও সেটাকে আর মেটানো যায় না। সেই অদৃশ্য পাঁচিলটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতো বেশি মজবুত হয়ে যায় যাকে সামান্য ছেঁনি বা হাতুড়ি দিয়ে আর ভাঙা সম্ভব হয়ে ওঠে না। হ্যাঁ, হয়তো বুলডোজার চালিয়ে তাকে ভাঙা যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য সেই বুলডোজার অর্থাৎ মনের ইচ্ছে এবং প্রচেষ্টা দুটোকেই সমান ভাবে, সবটা দিয়ে কাজে লাগাতে হবে; নিজের অহংকারকে দূরে সরিয়ে সদিচ্ছার সাথে সেই মনোমালিন্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে; তবেই সেই পাঁচিল ভাঙতে পারে, দূরত্ব মিটতে পারে। 

কিছু দূরত্ব শত চেষ্টা করেও মেটানো যায় না। কোন প্রিয়জন যদি ইহলোক ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দেয়, সেই দূরত্ব মেটানো কোনভাবেই সম্ভব নয়; স্বয়ং ঈশ্বরও সেই দূরত্ব মেটাতে পারেন না। ইহলোকের সঙ্গে পরলোকের যোগাযোগের রাস্তাটা যে একমুখী, দূরত্ব মুছবে কি করে? এই জগতের মানুষ যতক্ষণ না ওই জগতে পৌঁছাচ্ছে ততক্ষণ এই দূরত্ব বহাল থাকবে। আমরা তাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করি, তাদের অনুপস্থিতি অনুভব করি, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না, তাদের স্পর্শ করতে পারি না, তাদের সঙ্গে সুখ দুঃখ ভাগ করতে পারি না। তখন সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটার গুরুত্ব আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি।  বিভিন্ন উপায়ে আমরা তাদের মনে করি, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কেউ তাদের চোখের জলে স্মরণ করে তো কেউ হাসিমুখে, আবার কেউ বা বিভিন্ন সমাজমূলক কাজের মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণীয় করে রাখে। সেক্ষেত্রে মানসিক দূরত্বটা কোনোভাবেই থাকে না, কিন্তু ভৌত বা শারীরিক দূরত্বটা থেকেই যায় যা কোনোদিনও মেটানো সম্ভব নয়।

জীবন খুব দুর্লভ যাকে সযত্নে সস্নেহে বাঁচতে হয়। জীবনে উপস্থিত প্রত্যেকটি জীবের সাথে একটা সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টা করতে হয় কারণ প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে প্রয়োজন হয়। কেউ বেশী কম, ছোট বড় নয়, সবারই সমান অধিকার, সমান গুরুত্ব রয়েছে। তাই যত বেশী আমরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকব আমরাই লাভবান হব। নইলে সামান্য কারণে তৈরী দূরত্বটা এতটাই বেড়ে যাবে যাকে হয়তো আমরা কোনোদিনও হাজার চেষ্টা করেও মেটাতে পারব না। তাই যতটা সম্ভব এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা যাতে পাঁচিলটা ছোট থাকতেই তাকে আমরা ভেঙে ফেলতে পারি। কারণ মানব সৃষ্ট দূরত্বের ওপর আমাদের হাত আছে কিন্তু নিয়তির সৃষ্ট দূরত্বের ওপর নেই। পরলোকে পাড়ি দেওয়া প্রিয়জনের অভাব আমরা এতটাই অনুভব করি যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূণ্যতা আরও বাড়ে বই কমে না। অগণিত চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে ছুঁতে না পারার কষ্ট, তার সঙ্গে কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা কমানোর কোনও ওষুধ আজ অবধি আবিষ্কৃত হয় নি। এই ক্ষতি বা লোকসান যা কিছু তা তো আমাদেরই! আর এই ক্ষতি স্বয়ং নিয়তিও পূরণ করতে পারে না কারণ তাঁরই তৈরী নিয়ম সবার জন্য সমান, তাঁর জন্যও!!!


ঋতুপর্ণা বসাক

গণ্ডীর ঘরে বাইরে

  মানুষ যুগের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড বেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শুধু নিজের, নিজের পরিবার, নিজের জীবন, নিজের পেশা, নিজের সুখ এইগুলোই প্রত্যেকের জ...

Popular Posts