Thursday, May 28, 2026

গণ্ডীর ঘরে বাইরে

 


মানুষ যুগের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড বেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শুধু নিজের, নিজের পরিবার, নিজের জীবন, নিজের পেশা, নিজের সুখ এইগুলোই প্রত্যেকের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নিজের সবকিছু নিয়ে গণ্ডী তৈরী করে তার মধ্যেই জীবন কাটাচ্ছে। অন্যের চিন্তা মনেও আসে না। শুধু নিজের সব ঠিক, সব সুরক্ষিত থাকলেই হল, বাইরের কার কি হল সেই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে যে বাইরে যদি আগুণ লাগে তার আঁচ একসময় ঘরেও এসে লাগেবাইরেটা যদি ঠিক না থাকে তবে ঘরের ভেতরের পরিবেশও আস্তে আস্তে বেঠিক হয়ে যায়। 

প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামের লড়াই, বাস্তবের কঠিনতা, প্রতিমুহূর্তের প্রতিযোগিতা মানুষকে কোথাও যন্ত্রে পরিণত করছে যার মধ্যে আবেগ, অনুভূতি সবই আছে কিন্তু তার অনুভব বা প্রকাশ সবটাই ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। আগে নিজে যদি বাঁচে তবে তো অন্যের কথা ভাববে। জীবন প্রতিমুহূর্তে একটা করে লক্ষ্য বা টার্গেট দিয়ে যাচ্ছে আর সেটা পূরণ করতে করতেই সময় চলে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য পূরণের দৌড়ে যেখানে নিজেকেই ভুলে যায়, নিজের চাওয়া পাওয়ার কথা মনেও আসে না সেখানে অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? কিন্তু এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে এই টার্গেটগুলো পূরণ করতে গেলে অন্যের সাহায্যের দরকার হয়, যেটা ঘরের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকেও আসে। তাই বাইরে সাহায্য না করলে বা বাইরের সাহায্য না পেলে ঘরের পরিস্থিতি বদলাতে সময় লাগে না।

একা কেউই বাঁচতে পারে না। কারও না কারও সাহচর্য লাগেই। বাইরের জগতে পা না রাখলে নিজের গণ্ডীর মধ্যেই কূপমন্ডুক হয়ে থেকে যায়। সবার সঙ্গে না মিশলে জ্ঞানের ভান্ডার, অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়বে কি করে? একা সব কাজ করা সম্ভব হয় না, অন্যের দরকার পড়েই। সেক্ষেত্রে নিজের গণ্ডীর মধ্যে বসে থাকলে বাইরের সাহায্য কি করে আসবে? আর গণ্ডীর বাইরে না বেরোলে অন্যের খোঁজ খবর জানা যাবে কি করে? তাদের সাহায্য করাই বা কি করে সম্ভব হবে?

ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে রাস্তার কিছু অংশটা দেখা যায়, বাকিটা অদৃশ্য থাকে। তার মানে তো এই নয় যে ওই আলোর বাইরে দৃষ্টির অগোচরে রাস্তাটাই শেষ হয়ে গেছে, শুধু আলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকী রাস্তাটুকুও আছে, সেটা শুধু খুঁজে নিতে হয়। ঠিক তেমনি মানুষ নিজের চারপাশের গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনটাকেই শুধু দেখছে। তার বাইরেও যে একটা জগৎ আছে সেটা ভুলেই যাচ্ছে। তাকে খোঁজার আর কোনো চেষ্টাই করছে না। তাকে খুঁজতে গেলে নিজের গণ্ডী পাড় করে বেরিয়ে আসতে হবে, তবেই বিশ্বসংসার নজরে আসবে। নিজের কথা ভাবা ভুল নয়, তবে নিজের সঙ্গে সবার জন্য না হলেও কিছু জনের কথা একটু ভাবাই যায়। এভাবে একে অন্যের জন্য যদি একটু করে ভাবতে শুরু করে, একজনের দরকারে অন্যজন সাহায্য করতে এগিয়ে যায় তবে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মানের জন্ম নেয় যা একে অপরের মধ্যে হৃদয়ের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে এবং তাদেরকে অন্যের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদেরকেও আরও ভরসা করতে, ভালোবাসতে শেখায়

ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, March 22, 2026

খুশীর ঠিকানা

 

সুখ, খুশী, আনন্দ এরা কোথায় থাকে? এই অনুভূতিগুলোকে কোথায় পাওয়া যায়? সুখ, খুশী এই শব্দগুলোর সঙ্গে সঙ্গে অনুভূতিগুলোও যেন স্বপ্নের মতো মনে হয়। এগুলোর ঠিকানা কেউ বলতে পারে না। এগুলো শুধু কল্পনা করা যায়, বাস্তবে খোঁজা অনর্থক। কাউকে বলতে শোনা যায় না যে সে সুখে আছে, আনন্দে আছে। নিজেদের চাহিদা, লোভ এসব মেটাতে গিয়ে, প্রতিনিয়ত ইঁদুর দৌড়ে জিততে গিয়ে মানুষ ভুলেই গেছে কি ভাবে সুখে থাকতে হয়, খুশী হতে হয়। 

মানুষ সুখ, খুশী এদেরকে বাইরে খুঁজে চলেছে। জীবনে সুখী হওয়ার জন্য, খুশী থাকার জন্য চারিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। তারা ভাবছে এগুলো অন্য কোথাও আছে, তাই তাদেরকে নিজেদের জীবনে আনার জন্য ভিত্তিহীন সব প্রতিযোগিতায় নাম লেখাচ্ছে। 

মানুষ সুখের পেছনে ছুটে চলে কিন্তু আসল সুখ কি সেটা বোঝার চেষ্টা করে না। সুখ, খুশী, আনন্দ এগুলো খুঁজে নিতে হয়। খুশী থাকা, আনন্দ পাওয়া, সুখী হওয়াটা একটা পদ্ধতি। অনেকের কিছু না থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের সুখী মনে করে কারণ তারা জানে তাদের যা আছে আরও অনেকের সেটা নেই। তাই তারা সেটা নিয়েই আনন্দে থাকে, খুশী থাকে। আবার অনেকে আছে যারা সব থেকেও খুশী নয় কারণ তারা সবসময় এটাই দেখে তাদের কি নেই আর অন্যের কি আছে। তারা জানেই না কিভাবে খুশী থাকতে হয়, কিভাবে অন্যকে খুশী রাখতে হয়। 'আরও চাই' এই মনোবৃত্তির কারণেই তারা না তো নিজেরা খুশী হতে পারে না অন্যকে খুশী দিতে পারে।

জীবনে চলার পথে অন্যের সম্পত্তির দিকে না তাকিয়ে নিজেদের যা আছে সেদিকে মনোযোগ দিলে বোঝা যায় আমরা কতটা সৌভাগ্য পেয়েছি যেটা অনেকেই হয়তো পায়নি। আর সেটা নিয়ে খুশী থাকতে শিখলে খুব সহজেই খুশী, আনন্দ, সুখ এদের চিনতে পারা যায় এবং নিজেদের জীবনে ধরে রাখা যায়। তখন আর এদের ঠিকানা অন্য কোথাও খুঁজতে যেতে হয় না, নিজেদের মধ্যেই এদের খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা নিজেরাই তখন এদের ঠিকানা হয়ে উঠি। খুশী থাকা এবং খুশী রাখা এটাই তো আসল কাজ


ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, January 25, 2026

নিঃশব্দ ঘাতক

 


সময় এগোতে থাকে, কাছের মানুষ দূরে যেতে থাকে। সময়, দূরত্ব, পরিবেশ, পরিস্থিতি আস্তে আস্তে কখন যে দূরত্ব বাড়াতে থাকে আমরা বুঝতেই পারি না। একই সময়ে একজনের জীবনে আনন্দ এবং অন্য জনের জীবনে দুঃখ নিঃশব্দে সেই দূরত্ব বাড়িয়ে চলে। একজনের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই আর অন্যদিকে আরেকজনের অনুকূলে আনন্দে ভেসে যাওয়া, একদিকে একজনের সফলতা এবং অন্যদিকে আরেকজনের বিফলতা একই সময়ে প্রকাশ দূরত্বকে ইন্ধন যোগাতে থাকে। আবার কখনও কখনও একই সময়ে দুজনেই ভিন্ন ভিন্ন লড়াই করে যাচ্ছে যা অপরজন জানতেও পারে না কারণ লড়াইটা তো সবাইকে নিজেকেই লড়তে হয়, তার হয়ে অন্য কেউ লড়তে পারে না। আসলে  দুজনেই নিজেদের লড়াইয়ে এতটাই জড়িয়ে যায় যে অন্যজনকে খবর দিতে পারে না বা অন্য কারও খোঁজ নেওয়ার অবকাশ পায় না। প্রিয়জনেরা কখন একে অপরের কাছে শুধু প্রয়োজন বা ধীরে ধীরে নিষ্প্রয়োজন হয়ে যায় কেউ বুঝতেও পারে না। 

কখনও পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজেরাও দায়ী হই। বিপদের সময় অনেকক্ষেত্রে এটা হয় যে অন্যকে জানালে তারা হয়তো সহানুভূতি দেখায়, কিন্তু এগিয়ে আসে না। কোন ক্ষেত্রে কেউ হয়তো অনেক দূরে আছে, তাকে জানিয়ে বিব্রত করতে ইচ্ছে করে না। আবার অনেকে আনন্দের সময় পাশে থাকে কিন্তু দুঃখের ভাগীদার হতে চায় না; কারণ দুঃখকে কেউই ভালোবাসে না। সবাই সুখে আনন্দে থাকতে চায়। তাই এই একপেশে মানসিকতার জন্য দূরত্বটা আরও বেড়ে যায়

দূরত্বের এই বাহ্যিকতার সঙ্গে সঙ্গে অন্তরের বা মনের দূরত্ব টাও বেড়ে যায়। অদৃশ্য এক দূরত্ব নিঃশব্দে এমনভাবে কাজ করতে থাকে যাতে দৃশ্যগত সবকিছুর উপস্থিতি আস্তে আস্তে কখন ফিকে হয়ে যায়। আর যখন অনুভব হয় সেই দূরত্বটা, তখন অনেকটা দেরী হয়ে যায় যেটা কমানোটা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই মাঝেমধ্যে যদি একে অপরের খোঁজ নিই, নিজেদের বর্তমান সুখ দুঃখ বা সমস্যাগুলো অল্প হলেও একে অপরের সঙ্গে আলোচনা করি তাহলে একে অপরকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং আর তার সঙ্গে প্রিয়জনেরাও নিষ্প্রয়োজন হয়ে যায় না। এতে দূরত্বটাও কমে আর বাহ্যিক বন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের বন্ধনও আরও দৃঢ় হয়


ঋতুপর্ণা বসাক

গণ্ডীর ঘরে বাইরে

  মানুষ যুগের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড বেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শুধু নিজের, নিজের পরিবার, নিজের জীবন, নিজের পেশা, নিজের সুখ এইগুলোই প্রত্যেকের জ...

Popular Posts