মানুষ যুগের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড বেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শুধু নিজের, নিজের পরিবার, নিজের জীবন, নিজের পেশা, নিজের সুখ এইগুলোই প্রত্যেকের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু নিজের সবকিছু নিয়ে গণ্ডী তৈরী করে তার মধ্যেই জীবন কাটাচ্ছে। অন্যের চিন্তা মনেও আসে না। শুধু নিজের সব ঠিক, সব সুরক্ষিত থাকলেই হল, বাইরের কার কি হল সেই নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে যে বাইরে যদি আগুণ লাগে তার আঁচ একসময় ঘরেও এসে লাগে। বাইরেটা যদি ঠিক না থাকে তবে ঘরের ভেতরের পরিবেশও আস্তে আস্তে বেঠিক হয়ে যায়।
প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামের লড়াই, বাস্তবের কঠিণতা, প্রতিমুহূর্তের প্রতিযোগিতা মানুষকে কোথাও যন্ত্রে পরিণত করছে যার মধ্যে আবেগ, অনুভূতি সবই আছে কিন্তু তার অনুভব বা প্রকাশ সবটাই ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। আগে নিজে যদি বাঁচে তবে তো অন্যের কথা ভাববে। জীবন প্রতিমুহূর্তে একটা করে লক্ষ্য বা টার্গেট দিয়ে যাচ্ছে আর সেটা পূরণ করতে করতেই সময় চলে যাচ্ছে। এই লক্ষ্য পূরণের দৌড়ে যেখানে নিজেকেই ভুলে যায়, নিজের চাওয়া পাওয়ার কথা মনেও আসে না সেখানে অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? কিন্তু এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে এই টার্গেটগুলো পূরণ করতে গেলে অন্যের সাহায্যের দরকার হয়, যেটা ঘরের সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকেও আসে। তাই বাইরে সাহায্য না করলে বা বাইরের সাহায্য না পেলে ঘরের পরিস্থিতি বদলাতে সময় লাগে না।
একা কেউই বাঁচতে পারে না। কারও না কারও সাহচর্য লাগেই। বাইরের জগতে পা না রাখলে নিজের গণ্ডীর মধ্যেই কূপমন্ডুক হয়ে থেকে যায়। সবার সঙ্গে না মিশলে জ্ঞানের ভান্ডার, অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়বে কি করে? একা সব কাজ করা সম্ভব হয় না, অন্যের দরকার পড়েই। সেক্ষেত্রে নিজের গণ্ডীর মধ্যে বসে থাকলে বাইরের সাহায্য কি করে আসবে? আর গণ্ডীর বাইরে না বেরোলে অন্যের খোঁজ খবর জানা যাবে কি করে? তাদের সাহায্য করাই বা কি করে সম্ভব হবে?
ল্যাম্পপোষ্টের আলোতে রাস্তার কিছু অংশটা দেখা যায়, বাকিটা অদৃশ্য থাকে। তার মানে তো এই নয় যে ওই আলোর বাইরে দৃষ্টির অগোচরে রাস্তাটাই শেষ হয়ে গেছে, শুধু আলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাকী রাস্তাটুকুও আছে, সেটা শুধু খুঁজে নিতে হয়। ঠিক তেমনি মানুষ নিজের চারপাশের গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবনটাকেই শুধু দেখছে। তার বাইরেও যে একটা জগৎ আছে সেটা ভুলেই যাচ্ছে। তাকে খোঁজার আর কোনো চেষ্টাই করছে না। তাকে খুঁজতে গেলে নিজের গণ্ডী পাড় করে বেরিয়ে আসতে হবে, তবেই বিশ্বসংসার নজরে আসবে। নিজের কথা ভাবা ভুল নয়, তবে নিজের সঙ্গে সবার জন্য না হলেও কিছু জনের কথা একটু ভাবাই যায়। এভাবে একে অন্যের জন্য যদি একটু করে ভাবতে শুরু করে, একজনের দরকারে অন্যজন সাহায্য করতে এগিয়ে যায় তবে একে অপরের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, সম্মানের জন্ম নেয় যা একে অপরের মধ্যে হৃদয়ের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে এবং তাদেরকে অন্যের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিজেদেরকেও আরও ভরসা করতে, ভালোবাসতে শেখায়।
ঋতুপর্ণা বসাক