দেব দানবের মন্থনের ফলস্বরূপ সমুদ্র গর্ভ থেকে জেগে ওঠে মন্দার পর্বত। মাতৃ জঠরে শিশু হলো সেই মন্দার পর্বত যার ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে তাকে মন্থন করা শুরু হয়। দেব দানবের মন্থন অর্থাৎ সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তির মন্থন। যে শিশুকে যেমন ভাবে মন্থন করা হয় তার ভেতরের প্রজ্ঞার বিকাশ সেইভাবে ঘটে।
এই সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তি বিকাশে ধ্বনির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এই ধ্বনির বিভিন্ন তারতম্য মানবদেহে বিভিন্ন কম্পনের সৃষ্টি করে যা সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন চক্রের বৈশিষ্ট্যতা বৃদ্ধি করে। আর এই বৈশিষ্ট্যতাগুলি সেই মানুষের ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে যা তাকে অন্যের থেকে আলাদা করে তোলে। ভালো কথা বা সুধ্বনি যদি বারবার বলা হয় তবে তার সেই কম্পন মানুষের মধ্যে মন্দার পর্বতের অপরের দিকে ধাক্কা মেরে তাকে উন্নত মানুষে পরিণত করে। আবার খারাপ কথা বা কুধ্বনি যদি বেশি উচ্চারিত হয় তবে তা মন্দার পর্বতের নীচের দিকে আঘাত হেনে সেই মানুষকে অবনতির দিকে চালিত করে।
মন্দার পর্বত মন্থনের সময় অনেক ভালো জিনিষ বেরিয়ে আসে যেমন ঐরাবৎ, কামধেনু; ঠিক তেমন মানুষের ভেতরের মন্দার পর্বতের সুপ্রবৃত্তির যত বেশী মন্থন হবে তত তার ভেতরের প্রজ্ঞার বিকাশ ঘটবে। আর যদিও কুপ্রবৃত্তির প্রভাব বেশী হয় তবে গরল বের হবে। এখন প্রশ্ন হলো সেই গরল কোথায় যায়? পুরাণে সেই গরল ভগবান শিব কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। কিন্তু এযুগে সেই মহাদেব কোথায়? দেব দানবের অর্থাৎ সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তির মন্থনে মানুষের ভেতরের গরল কখনো সে নিজে গ্রহণ করছে আবার কখনো অন্য মানুষকে গ্রহণ করতে হচ্ছে হয়তো স্বেচ্ছায় নয়তো অসহায় হয়ে। মহাদেবের মতো কণ্ঠে ধারণ করার ক্ষমতা না থাকার ফলে এই গরল শরীরে, মনে প্রবেশ করে জীবনকে এতোই বিষাক্ত করে তুলছে যে সবাই আর অমৃতের চেষ্টাই করছে না। কিন্তু অমৃত পেতে গেলে যে আরও কঠিন বল প্রয়োগ করতে হবে, নিরলস প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবেই অমৃত কলসসহ লক্ষী উঠে আসবে যে আমাদের এক সুন্দর জীবনের দিশা দেখাবে। আর এই লক্ষীলাভ করতে গেলে মন্দার পর্বতকে আরও মন্থন করতে হবে। যতবেশী মন্থন হবে তত বেশী মানুষ তার অন্তর জগৎকে চিনতে শিখবে, বাইরের জগতের বিশ্বরূপের সাথে ভেতরের বিশ্বরূপের মেলবন্ধন ঘটাতে পারবে।
ঋতুপর্ণা বসাক