Saturday, May 28, 2022

ধন্যবাদ!

 

ধন্যবাদ

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। সমাজে থাকতে গেলে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে হয়, একে অপরের বিপদে আপদে সাহায্য করতে হয়, সুখে দুঃখে পাশে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কাজ মিটে গেলে একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন না করা যা আজকের যুগে অত্যন্ত প্রবল।

'ধন্যবাদ' বা 'Thank you' খুব ছোট্ট শব্দ, কিন্তু তার অর্থ এবং ফল দুটোই খুব বড়। কাউকে ধন্যবাদ দেওয়ার অর্থই হলো তার কাজ বা সাহায্য বা সমর্থন কে উপলব্ধি করে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া। এর ফলে সেই ব্যক্তির সমস্ত পরিশ্রম সার্থক হয় এবং সে তার সেই কাজের মধ্যে জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়।

যখন আমাদের দরকার হয় তখন যার থেকে সাহায্য পাবো তাকে ব্যস্ত করে ছাড়ি। কিন্তু যেই কাজটা হয়ে গেলো আর তাকে মনে রাখি না, তার কাজের যথার্থ মূল্যায়ণ করার চেষ্টা করি না, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সামান্য ধন্যবাদ টুকুও দিতে ভুলে যাই। জীবনের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানুষজন আমাদের পাশে থাকে, সাহস যোগায়, সাহায্য করে; কিন্তু সবসময় আমরা বোধহয় তাদের যথার্থ সম্মান জানাতে পারি না। স্বয়ং ঈশ্বরকেও আমরা বাদ দিই না। তাঁর কাছে আমরা সবসময় চেয়ে যাচ্ছি, কিন্তু যেই সেটা পেয়ে গেলাম আর তাঁকে মনে রাখি না। তাঁকেও যে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত সেটাই আমাদের মনে হয় না।

ধন্যবাদ সবসময় কথায় দেওয়া যায় না। বিভিন্ন মাধ্যমেও ধন্যবাদ প্রকাশ করা যায়, তা সে অর্থ হোক বা উপহার বা কোন কিছুর অঙ্গীকার। ধন্যবাদ শব্দের মাধ্যমে আমরা একে অপরের পরিশ্রমকে সম্মান জানাই যা আমাদের জীবনের পথে এগিয়ে যেতে উৎসাহ যোগায়। ধন্যবাদ শব্দের মাধ্যমে আমরা একে অপরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি যা পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস রাখতে সাহায্য করে।

কাউকে বলা একটা ছোট্ট 'ধন্যবাদ' বা 'Thank you' হলো সেই জাদু চাবিকাঠি যা অনেক মনের বন্ধ দরজা খুলে সেখানে প্রবেশের অধিকার দেয়। ধন্যবাদ একজন মানুষের পরম কৃতজ্ঞতা,  নম্রতা এবং উপলব্ধিকে প্রকাশ করে। জীবনে শুভ অশুভ যাই আসুক না কেন তাকে গ্রহণ করে স্বীকৃতি দেওয়াই হলো জীবনের সমস্ত সম্পদের প্রধান ভিত্তি। কথায় বলে,

When life is sweet, say thank you and celebrate.

When life is bitter, say thank you and grow.


ঋতুপর্ণা বসাক

Thursday, April 28, 2022

দূরত্ব



'দূরত্ব' কথাটার মধ্যেই কেমন যেন একটা মন খারাপের গল্প লুকিয়ে রয়েছে। দূরত্ব মানেই যেন একটা অদৃশ্য পাঁচিল তৈরী হবার গল্প তা সে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক যে কোন রকম দূরত্বই হোক না কেন। সব ক্ষেত্রেই এই পাঁচিল গড়ে ওঠার পেছনে কোন কারণ অবশ্যই থাকে। কিছু দূরত্ব আমরা নিজেরা তৈরী করি আর কিছু কোন অদৃশ্য কারণ থেকে গড়ে ওঠে। কিছু দূরত্বের জন্য নিজেরাই দায়ী থাকি আবার কিছু দূরত্ব পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে যায়।  

সমাজে থাকতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন লোকজন, পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত হই; কোথাও সম্পর্ক খুব ভালো হয় কোথাও বা হয় না। অনেকক্ষেত্রে সম্পর্কে অসুস্থতা বোধ করলে সেখানে দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়। সেক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যই সুস্থ থাকে।আবার অনেক ক্ষেত্রে সামান্য মনোমালিন্যে, ভুল বোঝাবুঝিতে দূরত্ব তৈরী হয়। দূরত্বের ফলে একে অন্যের গুরুত্ব বুঝতে পারে।সেক্ষেত্রে মিটিয়ে নেওয়ার একটা ইচ্ছে তৈরী হয়। কেউ কেউ সেটা বিভিন্ন প্রচেষ্টার দ্বারা মিটিয়ে নেয়, কেউ সেটা পারে না। যারা পারলো না সেখানে দূরত্বটা বাড়তে থাকে। আর এই ক্রমবর্ধমান দূরত্বটা একসময় এতটাই বেড়ে যায় যে হাজার চেষ্টা করেও সেটাকে আর মেটানো যায় না। সেই অদৃশ্য পাঁচিলটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতো বেশি মজবুত হয়ে যায় যাকে সামান্য ছেঁনি বা হাতুড়ি দিয়ে আর ভাঙা সম্ভব হয়ে ওঠে না। হ্যাঁ, হয়তো বুলডোজার চালিয়ে তাকে ভাঙা যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য সেই বুলডোজার অর্থাৎ মনের ইচ্ছে এবং প্রচেষ্টা দুটোকেই সমান ভাবে, সবটা দিয়ে কাজে লাগাতে হবে; নিজের অহংকারকে দূরে সরিয়ে সদিচ্ছার সাথে সেই মনোমালিন্য দূর করার চেষ্টা করতে হবে; তবেই সেই পাঁচিল ভাঙতে পারে, দূরত্ব মিটতে পারে। 

কিছু দূরত্ব শত চেষ্টা করেও মেটানো যায় না। কোন প্রিয়জন যদি ইহলোক ছেড়ে পরলোকে পাড়ি দেয়, সেই দূরত্ব মেটানো কোনভাবেই সম্ভব নয়; স্বয়ং ঈশ্বরও সেই দূরত্ব মেটাতে পারেন না। ইহলোকের সঙ্গে পরলোকের যোগাযোগের রাস্তাটা যে একমুখী, দূরত্ব মুছবে কি করে? এই জগতের মানুষ যতক্ষণ না ওই জগতে পৌঁছাচ্ছে ততক্ষণ এই দূরত্ব বহাল থাকবে। আমরা তাদের প্রতি মুহূর্তে মনে করি, তাদের অনুপস্থিতি অনুভব করি, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না, তাদের স্পর্শ করতে পারি না, তাদের সঙ্গে সুখ দুঃখ ভাগ করতে পারি না। তখন সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষটার গুরুত্ব আমরা প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি।  বিভিন্ন উপায়ে আমরা তাদের মনে করি, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কেউ তাদের চোখের জলে স্মরণ করে তো কেউ হাসিমুখে, আবার কেউ বা বিভিন্ন সমাজমূলক কাজের মাধ্যমে তাদেরকে স্মরণীয় করে রাখে। সেক্ষেত্রে মানসিক দূরত্বটা কোনোভাবেই থাকে না, কিন্তু ভৌত বা শারীরিক দূরত্বটা থেকেই যায় যা কোনোদিনও মেটানো সম্ভব নয়।

জীবন খুব দুর্লভ যাকে সযত্নে সস্নেহে বাঁচতে হয়। জীবনে উপস্থিত প্রত্যেকটি জীবের সাথে একটা সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক রেখে চলার চেষ্টা করতে হয় কারণ প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে প্রয়োজন হয়। কেউ বেশী কম, ছোট বড় নয়, সবারই সমান অধিকার, সমান গুরুত্ব রয়েছে। তাই যত বেশী আমরা একে অপরের সাথে মিলেমিশে থাকব আমরাই লাভবান হব। নইলে সামান্য কারণে তৈরী দূরত্বটা এতটাই বেড়ে যাবে যাকে হয়তো আমরা কোনোদিনও হাজার চেষ্টা করেও মেটাতে পারব না। তাই যতটা সম্ভব এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করা যাতে পাঁচিলটা ছোট থাকতেই তাকে আমরা ভেঙে ফেলতে পারি। কারণ মানব সৃষ্ট দূরত্বের ওপর আমাদের হাত আছে কিন্তু নিয়তির সৃষ্ট দূরত্বের ওপর নেই। পরলোকে পাড়ি দেওয়া প্রিয়জনের অভাব আমরা এতটাই অনুভব করি যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই শূণ্যতা আরও বাড়ে বই কমে না। অগণিত চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে ছুঁতে না পারার কষ্ট, তার সঙ্গে কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা কমানোর কোনও ওষুধ আজ অবধি আবিষ্কৃত হয় নি। এই ক্ষতি বা লোকসান যা কিছু তা তো আমাদেরই! আর এই ক্ষতি স্বয়ং নিয়তিও পূরণ করতে পারে না কারণ তাঁরই তৈরী নিয়ম সবার জন্য সমান, তাঁর জন্যও!!!


ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, April 17, 2022

হার - জিত


'হার' বা 'জিত' এই শব্দ দুটো আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের প্রাপ্তি এবং অপ্রাপ্তি গুলোকে সূক্ষ ভাবে বিশ্লেষণ করে চলেছে। 'আমি হেরে গেছি' বা 'আমি জিতে গেছি' এটা যেমন একটা মানুষের ভাবনাকে বা চিন্তাধারাকে বর্ণনা করে, ঠিক তেমনি তার পারিপার্শ্বিক সমাজ ব্যবস্থার  মানসিকতারও পরিচয় দেয়। প্রত্যেকেই তার সেরাটা দেয়, সবাই জিততে চায়। তাই যখন কেউ হেরে যায় সমাজ যদি তার সেই পরিশ্রমের মূল্যটা দেয় এবং ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার জন্য উৎসাহ জোগায় তাহলে হার টা আর দুঃখ মনে হয় না, সেটা আর হার থাকে না। তাই একটা জয় বা পরাজয় বিভিন্ন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের সাক্ষ্য বহন করে।

মানুষ ছোট থেকেই এই জয় বা পরাজয় ব্যাপারটা খুব ভালো করে শিখে যায়। কোনো শিশু যখন কোন প্রতিযোগিতা জেতে বা পরীক্ষায় ভালো ফল করে তখন চারপাশের সমাজের বাহবা, প্রশংসা তাকে বুঝিয়ে দেয় তার গুরুত্ব কতোটা। আবার যখন সে কোন কিছুতে হেরে যায় বা পরীক্ষায় কম নম্বর পায় বা ফেল করে তখনও চারপাশের মানুষদের তাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা তাকে হতাশার সমুদ্রে ঠেলে দেয়। তাকে এটাই বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে যতক্ষণ সে জিততে পারবে সবাই তাকে মাথায় করে রাখবে, আর হেরে গেলে হারিয়ে যাবে যার কেউ খোঁজও করবে না। হেরে যাওয়া এক বিশাল অপরাধ  - এই বার্তাই সবার কাছে পৌঁছানো হয়।

মানুষ ভুলে যায় যে একটা প্রতিযোগিতায় একজনই প্রথম হয়, সবাই প্রথম হয় না। তাই কাউকে না কাউকে তো হারতেই হবে। তাহলে তারা কোথায় যাবে? আর যারা জিতলো তারা তো সবসময় নাও জিততে পারে। হেরে গেলে যদি শুধু অবজ্ঞা, অবহেলা মেলে তাহলে জয়ীদের মনেও একটা ভয় কাজ করতে থাকে, একটা মানসিক চাপ মনের মধ্যে গেঁথে বসে। তাতে সমস্যা বাড়ে বই কমে না। হার জিত একটা তাৎক্ষণিক ব্যাপার, কিন্তু সমাজ একে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে এর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। হারটাকে শিক্ষা মনে করে যদি মেনে নেওয়া যায় তাহলে সেটা জয়ের থেকেও বড়ো হয়ে যায়, আর কোন সমস্যা, লজ্জা, বা ভয় থাকে না। সমাজ একটা সুস্থ ব্যাপার কে নিজেদের তৈরি দাঁড়িপাল্লায় ফেলে অসুস্থ করে তুলেছে। জয় মানে সবকিছু আর পরাজয় মানে কিছু না এই ভুল চিন্তাধারার বীজ সবার মনে বপন করে চলেছে।

জীবনকে জয় পরাজয়ের দাঁড়িপাল্লায় মেপে বিচার করা যায় না। জীবনে জয় পরাজয় দুটোরই সমান প্রয়োজনীয়তা আছে। জয় আমাদের পরিশ্রমের স্বার্থকতার আনন্দ দেয়, এগিয়ে নিয়ে যায়, অন্যকে পথ দেখাতে শেখায়। আর পরাজয় আমাদের ব্যর্থতার দুঃখ দেয়, ভুল থেকে শিক্ষা দেয়, নতুন করে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা জোগায়। ব্যাপারটা অনেকটা অঙ্ক কষার মতো, হয় মিললো নয় মিললো নামিলে গেলে পরের অঙ্কে চলে যাবো, না মিললে আবার করতে হবে। ঠিক সেরকম জিতে গেলে এগিয়ে যেতে হবে আর হেরে গেলে সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে জেতার জন্য আবার তৈরি হতে হবে। দুটো অভিজ্ঞতাই দুরকম শিক্ষা দেয়। তাই জীবনের পথে দুটোরই সমান কৃতিত্ব রয়েছে। তাই জিতলে আমরা যেমন সেটা উদযাপন করি পরাজয়ও উদযাপন করা দরকার।

একটা সুস্থ মানসিকতার পেছনে জয় পরাজয় দুটোরই সমান ভূমিকা আছে। জয়ী হলে তার আনন্দ আর পরাজিত হলে তার দুঃখ দুটোই আমাদের জীবনের চড়াই উৎরাই এর সাথে পরিচয় করায়। আজ জিতলে কাল হারতেও পারি, আবার আজ হারলে কাল জিততেও পারি। কোন কিছুই স্থিতিশীল নয়, দুটো পরিস্থিতিকেই সমান ভাবে গ্রহণ করতে হয়। তাই জিতলে আনন্দে ভেসে যাওয়ার কিছু নেই, আবার হারলে হতাশায় ডুবে যাওয়ার দরকার নেই। জীবন গতিশীল - আজ একরকম হলে কাল অন্যরকম হবে। জয়ের আনন্দ আর পরাজয়ের দুঃখ এই দুই অবস্থার সাথে পরিচয় থাকলে জীবনে যে কোনও পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে সুবিধা হয়, কোনও সমস্যায় পড়তে হয় না। যে কোনও একটার সঙ্গে পরিচয়ে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। হার জিত উভয়ের মেলবন্ধন জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলে, তাকে সম্পূর্ণ রূপ দেয়।


ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, March 20, 2022

ভালো থাকা একটা মানসিকতা


"ভালো আছি" কথাটা আমরা সবসময় খুব সহজে বলতে পারি না, কোথাও একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। সে জায়গায় বরং 'চলে যাচ্ছে' কথাটা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দে বলে দিই। আসলে ভালো থাকাটা কোথাও যেন অনেক শর্তের সাথে জড়িত। শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন দিক বিচার করে ভালো থাকার সংজ্ঞা দেওয়া হয়। আর এই শর্তগুলি প্রত্যেক মানুষের কাছে আলাদা ভাবে প্রাধান্য পায়। কারও কাছে শারীরিক ভাবে ভালো থাকা খুব দরকার, আবার কারও কাছে অর্থনৈতিক ভালো থাকাটা সবচেয়ে জরুরী। তাই কে কিসে ভালো আছে সেটা সেই মানুষটাই বলতে পারবে। একজন যে শর্তে ভালো থাকবে অন্যজনও সেই একই শর্তে ভালো থাকবে এমনটা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। ভালো থাকাটা মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার

ভালো থাকা অনেকটা মানসিকতার ওপরও নির্ভরশীল। কারও সব থাকা সত্ত্বেও সে মনে করে যে সে ভালো নেই, আবার কারও কিছু না থাকা সত্ত্বেও সে মনে করে সে খুব ভালো আছে। মানুষ সবসময় অন্যের কি আছে আর নিজের কি নেই সেটা দেখে ভালো থাকা খারাপ থাকা বিচার করতে ব্যস্ত। তার কাছে কি আছে আর অন্যের কাছে কি নেই সেটা কখনও বিচার করে না। সে এটা কখনোই ভাবে না যে সে আজ যা পেয়েছে বা যেখানে পৌঁছাতে পেরেছে সেটা এখনও লক্ষ মানুষের স্বপ্ন যা পাওয়ার জন্য তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে।

মানুষ চাহিদা আর প্রয়োজন এই দুটোর মধ্যে গুলিয়ে ফেলছে। 'অন্যের আছে আমার নেই' এই তুলনা থেকে চাহিদা বাড়ছে এবং মানুষ এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রমাণ করার জন্য নেমে  পড়েছে। প্রয়োজনটাকে যদি প্রাধান্য দিয়ে সেটাকে সীমাবদ্ধ করা যায় তাহলে ভালো থাকাটা হাতের মুঠোয়। কিন্তু যদি চাহিদার পেছনে ছোটে তাহলে কোনোদিনও ভালো থাকতে পারবে না কারণ 'আরও চাই' এই ইচ্ছেটা তাকে সারাজীবন ছুটিয়ে বেড়াবে, শান্তি দেবে না।

মানুষ যদি একে অপরের সাথে নিজেকে বড় দেখানোর প্রতিযোগিতায় না নেমে একে অপরকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে, একে অপরের সঙ্গে সুখ দুঃখে অংশীদার হয় তবে ভালো থাকাটা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। যত একে অপরের সঙ্গে মনের কথা বলবে, বিপদে আপদে একে অপরের পাশে দাঁড়াবে তত তার লোকবল বাড়বে, বন্ধু বাড়বে, শুভাকাঙ্খী হবে এবং সে মানসিক ভাবে ভালো থাকবে যেটা জীবনে সবচেয়ে বেশি দরকার। যত মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে তত মানুষ সব দিক দিয়ে ভালো থাকবে এবং তার জন্য মানুষকে চাহিদা আর প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্যটা ভালো করে বুঝতে হবে। কথায় বলে,

"জীবনকে প্রয়োজনের মতো বাঁচতে হয়, চাহিদার মতো নয়।

কারণ প্রয়োজন ভিখারীরও পূরণ হয়ে যায় আর চাহিদা বাদশারও অপূর্ণ থেকে যায়।"


ঋতুপর্ণা বসাক

Sunday, February 27, 2022

পুতুলখেলা

 

ছোটবেলায় পুতুল খেলেনি এমন মানুষ বোধহয় নেই তা সে পুরুষ মহিলা যেই হোক, কেউ কম কেউ বেশী। পুতুলখেলা জীবনের এক অনন্য শিক্ষা যা আমাদের এক রূপকথার জগতের সাথে পরিচয় করায় যেখানে সবাই সবাইকে ভালোবাসে, সকলে মিলেমিশে থাকে। পুতুলখেলা মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায় তা সে ছোটবেলা হোক বা বড়োবেলা।

বর্তমানে মানুষ যে জীবনযাপন করছে তাও তো একপ্রকার পুতুলখেলাই। কদিনের অতিথি মাত্র এখানে; থাকছি, খেলছি, শিখছি, কাজে লাগাচ্ছি এবং সব শেষে সব কিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কোনো কিছু নিয়েও আসিনি, আর কোনো কিছু নিয়েও যাবো না। গীতায় নিষ্কাম কর্মের কথা এইজন্যই বোধহয় বলা হয়েছে। এই দ্বন্দ্ব, হিংসা, দ্বেষ সব এক কঠিন বাস্তব জীবনের অঙ্গ যার অন্তিমে কোনো মূল্যই থাকে না। এও এক পুতুলখেলা যেখানে বিভিন্ন চরিত্র তাদের জন্য নির্দিষ্ট রূপ, ভাব ও কাজের চরিত্রায়ন করে যাচ্ছে। জীবনের চড়াই উৎরাই এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে পুতুল খেলছে বা কখনো নিজেরাই অন্যের হাতে পুতুল হয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো অন্যকে পুতুল হতে দেখে জীবনের শিক্ষা নিচ্ছে। তাই পুতুলখেলা এক অভিনব শিক্ষা। 

ছোট, বড়, সাদা, কালো, রঙিন হরেক রকম পুতুলের মতো মানুষের বিভিন্নতাও আমরা দেখতে পাই। যেরকম কোনো পুতুল বেশী পছন্দের, কোনটা কম সেরকম কোনো মানুষ খুব প্রিয় কেউ বা কম। ছোটবেলার পুতুলখেলা আমাদের বাস্তব জীবনের প্রথম পদক্ষেপের প্রাথমিক শিক্ষাটা দেয়। পুতুলখেলা হল বাস্তবের কঠিনতা কল্পনার মোড়কে পরিবেশিত হওয়া এক সুন্দর রূপকথা। এই রূপকথায় সবাই ভালো, সুন্দর, উপকারী এবং অনন্য। শৈশব থেকে এই পজিটিভ চিন্তা ভাবনায় শিশুদের তৈরী করার কারণ হয়তো তাদের মনে এই বিশ্বাসটা জাগানো যে এই পৃথিবীটা খুব সুন্দর। তাই এখানে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণও সুন্দর।  প্রথমেই যদি তাদের বাস্তবের কঠিনতা বা রূঢ়তা দেখিয়ে দেওয়া হয় তাহলে হয়তো তারা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে পারে। হয়তো আর এগোতে নাও চাইতে পারে। তাই তাদের সেই ভীতি থেকে দূরে রেখে ধীরে ধীরে বাস্তবের কঠিনতার সাথে পরিচয় করাতে এই পুতুলখেলা যেখানে তারা শেখে জীবনে সমস্যা আসবে কিন্তু সেটা আবার চলেও যাবে। সবই ক্ষণস্থায়ী, চিরস্থায়ী কেউ নয়। গভীর ভাবে অন্তরদৃষ্টি দিয়ে দেখলে বলা যায় আমরা সবাই পুতুল আর এক ঐশ্বরিক শক্তি আমাদের নিয়ে পুতুল খেলছে। তাই তো কবি নজরুল ইসলাম লিখেছেন,

"খেলিছ, এ বিশ্বলয়ে

বিরাট শিশু আনমনে,

খেলিছ, এ বিশ্বলয়ে

বিরাট শিশু আনমনে,

খেলিছ.....

প্রলয়সৃষ্টি তব পুতুলখেলা

নিরজনে প্রভু নিরজনে..."


ঋতুপর্ণা বসাক

Saturday, January 22, 2022

নিঃসঙ্গতা

 



নিঃসঙ্গতা জীবনের এক কঠিন বাস্তব রূপ যাকে কেউ আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আক্ষরিক ভাবে এর অর্থ বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে দেবে যা নির্ভর করে তারা কিভাবে একে উপলব্ধি করেছে। 'নিঃসঙ্গ' শব্দটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই  এক নেগেটিভ বা দুঃখজনক অনুভূতি বা চিন্তা মনে আসে যা আমাদের এক গভীর দুঃখের সমুদ্রে নিমজ্জিত করে। কিন্তু অন্য ভাবে দেখলে এর উপকারী দিক টাও দেখা যায়। কারণ যখনই নিঃসঙ্গতা অনুভব করি তখনই নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করি যা অন্যসময় আমরা ভাবি না।

ব্যস্ত জীবনের কোলাহলে আমরা নিজেদের মনের কথা শুনতে পাই না। আর ঠিক তখনই নিঃসঙ্গতা আমাদের সবাইকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। অবসাদের অতল গভীরে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। 'আমি একা', 'আমার কেউ নেই' - এইসব কথাগুলো কেউ যেন আমাদের কানে কানে এসে সর্বদা বলে যাচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে আমরা যেন অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছি।

মানুষ এখন সবাই ব্যস্ত, সারাক্ষণ ছুটছে। তার নিজেকে দেবার মতোই সময় নেই তো অন্যকে কি সময় দেবে। যতক্ষণ অন্যদের সাথে আছি হইহুল্লোড় করে আনন্দ করে কাটাচ্ছি; যেই একা থাকছি নিঃসঙ্গতা অনুভব করছি। তাই সবাই আমরা নিঃসঙ্গ জীবনই কাটাচ্ছি। এইসব আনন্দ, হুল্লোড় সবকিছুই বহির্মুখী ব্যাপার। এরা ক্ষনিকের অতিথি; কিছুক্ষণের জন্য আসে, আনন্দ দেয়, তারপর চলে যায়; হৃদয় স্পর্শ করে না। সবকিছু যেন কেমন লোক দেখানো প্রতিযোগিতার অঙ্গ হিসাবে কাজ করে যাচ্ছে। হৃদয় তাকে অনুভব করল কি না বা হৃদয় আনন্দ পেলো কি না তাতে আমাদের কারও কিছু এসে যায় না, তা নিয়ে ভাবার সময় আমাদের নেই। আমরা সেই ক্ষনিকের বহির্মুখী আনন্দে মশগুল। তাই যেই সেটা অনুপস্থিত হচ্ছে এক গভীর শূণ্যতা আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা অবসাদে ভুগতে শুরু করছি। 

নিঃসঙ্গতা প্রকৃত অর্থে ভালো লাগার বস্তু নয়। কিন্তু যারা কোন সাধনা করছেন তা সে শিক্ষা সম্পর্কিত বা আধ্যাত্মিক বিষয় যাই হোক তাদের নিঃসঙ্গতা ভালো লাগে কারণ তাতে তাদের উন্নতি হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষদের জন্য এটা মোটেই সুখপ্রদ হয় না। ডাক্তাররাও একা থাকতে বারণ করেন, সবার সঙ্গে মেলামেশা করতে বলেন। আর সত্যিই যদি কেউ নিঃসঙ্গ থাকেন তবে তাকে সেই একাকিত্ব কাটানোর রাস্তা খুঁজে বার করতে হবে। তিনি বই পড়ে, ছবি এঁকে, গান করে বা লেখালেখি করে বিভিন্ন উপায়ে নিজের সময় কাটাতে পারেন। তার পছন্দের কাজ করে নিজের সুপ্ত ইচ্ছেগুলি পূরণ করতে পারেন, নিজেরা হারিয়ে যাওয়া গুনাবলীর পুনরায় বিকাশ ঘটিয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে পারেন।রাস্তা অনেক আছে কিন্তু সেটা খুঁজে বার করতে হবে।

তবে কোথাও কি এই শূণ্যতা, এই অবসাদের জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী নই? আমরা আনন্দ কে বাইরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। অথচ ভালো করে অনুভব করলে দেখবো আমাদের অন্তরেই এক বিশাল রত্নভান্ডার আছে যাকে আমরা খোঁজ করার চেষ্টা কখনও করি না। তার জন্য মনকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্তরমুখী করতে হবে যাতে সে নিজেকে ভালোবেসে তাকে সময় দেয়। মন যেখানে উঁকি দিলে দেখা যাবে অনন্ত এক ভান্ডার আবিষ্কারের জন্য তার আবিষ্কারকের অপেক্ষায় দিন গুনছে। আর তাকে পেতে গেলে সেই পথের দিকে নির্ভীক চিত্তে এগোতে হবে, নিজেকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। নিজের মনের গভীরে ডুব দিতে হবে, ওপরে সাঁতার কাটলে তো হবে না।


ঋতুপর্ণা বসাক

Wednesday, December 22, 2021

দৃশ্য অভিন্ন কিন্তু দৃষ্টি বিভিন্ন!!!

 



মানুষ বড়োই বিচিত্র। একই অস্তিত্বের বিভিন্ন অনন্য রূপ। একই মানুষ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন মানসিকতার পরিচয় দেয়। আবার কখনও বা একই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব একই মতামত ব্যক্ত করে। এই স্বতন্ত্র বৈশাদৃশ্যই মানুষকে একে অপরের থেকে আলাদা করে। প্রত্যেকের নিজস্ব দৃষ্টিকোণ রয়েছে যা কোনো ঠিক বা ভুলের  দাঁড়িপাল্লায় মাপা যায় না। আমরা প্রত্যেকেই একে অপরের থেকে দেখে শিখি, একে অপরের  সাথে আলোচনা করে শিখি; কিন্তু পরিশেষে নিজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গড়ে তুলি।

প্রতিটা মানুষ নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনকে দেখে এবং  জীবন অতিবাহিত করে যেটা তার অভিজ্ঞতা, শিক্ষা থেকে গড়ে ওঠে। তাই একের দৃষ্টিকোণ অন্যের কাছে বিচিত্র মনে হতেই পারে, সেটা নিয়ে নিজস্ব মতামত থাকতেই পারে; কিন্তু সেটা নিয়ে সমালোচনা করার আগে অবশ্যই ভাবা দরকার। সেই মানুষটির পারিপার্শ্বিক অবস্থা, প্রকৃতি, ধ্যান ধারণা সব বিচার করে তারপর তার মূল্যায়ন করা দরকার যে সত্যিই সেটা সমালোচনার যোগ্য কি না; কারণ একজন মানুষ কি অবস্থার সম্মুখীন হয়ে কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ সেই পরিস্থিতি, তার মানসিক অবস্থা এবং ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করে। তাই সমালোচনা যদি করতেই হয় তবে সেই মানুষটির জায়গায় নিজেকে বসিয়ে সব কিছুর যথাযথ বিচার বিশ্লেষণ করে তারপর করলে ভালো হয়। তাতে সমস্যা কম তৈরি হয়।

জীবন আমাদের সব থেকে বড় শিক্ষক। সে তার জ্ঞান, সময়, দর্শন সব দিয়ে আমাদের তৈরি করে দেয় যাতে আমরা নিজেদের জীবনকে ঠিকঠাক বুঝে নিয়ে বাঁচতে শিখি, তাকে উপভোগ করতে শিখি। শিক্ষক সব ছাত্রছাত্রীকে সমান শিক্ষা দেয়; কিন্তু এটা নির্ভর করে ছাত্রছাত্রীদের ওপর তারা কতটা সেই শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং কিভাবে করছে। তাই জীবনের দেওয়া শিক্ষা বিভিন্ন ব্যক্তি বিভিন্ন ভাবে গ্রহণ করছে যার ওপর ভিত্তি করে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ তৈরি হচ্ছে। তাই তাকে আমরা কোনো প্রতিযোগিতায় নামিয়ে বিজয়ী বা পরাজিতের তকমা দিতে পারি না।

জীবনের শিক্ষা বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রূপে প্রকাশ পেয়েছে তা সেটা মানুষ, পশু, পাখি, গাছপালা যেই হোক। কারও কাছে সে খুব সুন্দর, কারও কাছে সে কঠিন বাস্তব। তাই একের দৃষ্টিভঙ্গি অপরের সাথে নাও মিলতে পারে আবার মিলতেও পারে। এটা কোনো সমস্যার বিষয় নয়। সমস্যা হল যখন একজন কোনো কিছু বিচার বিশ্লেষণ না করে আর একজনের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে এবং নিজের মতামত তার ওপর চাপিয়ে দেয়। সবাই সব পরিস্থিতি সমান ভাবে দেখে না এবং তার মোকাবিলাও আলাদা আলাদা ভাবে নিজের সাধ্য বুঝে, নিজের জীবনের দেওয়া শিক্ষার ওপর ভরসা করে তারপর করে। ব্যাপার টা হল ইংরেজিতে '6' আর '9' এর মতো। যেটা একজন এদিকে দাঁড়িয়ে '6' দেখছে, সেটাই অন্যজন ওদিকে দাঁড়িয়ে '9' দেখছে। তাই দুজনেই ঠিক কারণ দুজনেরই দৃষ্টি সঠিক কিন্তু দুজনের অবস্থান আলাদা। আর এটাই শাস্বত সত্য!!!

ঋতুপর্ণা বসাক


গণ্ডীর ঘরে বাইরে

  মানুষ যুগের সঙ্গে সঙ্গে বড্ড বেশী আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। শুধু নিজের, নিজের পরিবার, নিজের জীবন, নিজের পেশা, নিজের সুখ এইগুলোই প্রত্যেকের জ...

Popular Posts